জলবায়ু সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটা: ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে?

Opinion & Policy Policy Lens

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। তাপপ্রবাহ, বন্যা, দাবানল, খরা ও ঘূর্ণিঝড় বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা বদলে দিচ্ছে। ঠিক এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি প্রভাবশালী দেশ যখন জলবায়ু নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়, তখন এর প্রভাব শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বিশ্বব্যবস্থাকেই নাড়িয়ে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু নীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা মূলত একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন যেখানে জলবায়ু সংকটকে বৈজ্ঞানিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই অবস্থান জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একটি বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।

প্রথমত, জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি পুনরায় নির্ভরশীলতা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র তেল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর পথে হাঁটছে। এটি শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন অনেক দেশেই সস্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।

দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত জবাবদিহি ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব কমে আসা একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। যখন নীতিনির্ধারণে দূষণ কমানোর স্বাস্থ্যগত সুফলের চেয়ে শিল্পখাতের স্বল্পমেয়াদি ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ – বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

তৃতীয়ত, জলবায়ু গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা দুর্বল করা ভবিষ্যতের জন্য এক ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আবহাওয়া পূর্বাভাস, দুর্যোগ প্রস্তুতি, কৃষি পরিকল্পনা কিংবা জলবায়ু অভিযোজন – সব ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য তথ্য ও গবেষণা অপরিহার্য। এই সক্ষমতা কমে গেলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি বাড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহযোগিতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়। এটি এমন এক সংকট, যেখানে একটি দেশের সিদ্ধান্ত অন্য দেশের বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে। জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক আলোচনায় নেতৃত্বের অভাব উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় ভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় – এসব বাস্তবতায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক দায়বদ্ধতার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। যখন বড় শক্তিগুলো পিছু হটে, তখন অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

তবে এই পরিস্থিতি আমাদের একটি বাস্তবতাও মনে করিয়ে দেয়: জলবায়ু নেতৃত্ব শুধু রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিক সমাজ, গবেষক, স্থানীয় সরকার, যুবসমাজ এবং সামনের সারির কর্মীরাই এখন জলবায়ু কর্মকাণ্ডের প্রকৃত চালিকাশক্তি। বড় শক্তির অনুপস্থিতিতে এই কণ্ঠগুলোই বৈশ্বিক আলোচনায় ভারসাম্য আনতে পারে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর দেখিয়েছে, জলবায়ু নীতি কতটা রাজনৈতিক হতে পারে। কিন্তু জলবায়ু সংকট নিজে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ মানে না। প্রকৃতি কোনো নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষা করে না।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন একটাই—বিশ্ব কি অপেক্ষা করবে, নাকি বিকল্প নেতৃত্বের পথে এগোবে? ইতিহাস বলছে, সংকটের সময় নেতৃত্ব শূন্যতা থাকলে নতুন কণ্ঠই সামনে আসে। জলবায়ু সংকটও হয়তো আমাদের সেই দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।

Editorial Lead, The Edge of Delta

Leave a Reply