এক যুগান্তকারী রায়ে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ঘোষণা করেছে যে নিরাপদ পানযোগ্য পানি পাওয়া নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার। এই রায় দেশের পানি শাসনব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আর্সেনিক দূষণ, নগর পানিসংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চাপের প্রেক্ষাপটে এই রায়কে পানি ন্যায়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে নিরাপদ পানি পাওয়া একটি মৌলিক মানবাধিকার, যা সংবিধানের জীবনের অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩২) এবং মানবিক মর্যাদার অধিকার–এর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা ছাড়া জনস্বাস্থ্য, মানবিক জীবন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আদালতের নির্দেশনা: রাষ্ট্রের করণীয় কী
নিরাপদ পানযোগ্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালত সরকারকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
- দেশের সকল পানির উৎস যেন ক্ষয়িষ্ণু না হয়, শুকিয়ে না যায় এবং দূষিত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
- পানির উৎস রক্ষা ও পানি মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী-
- আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক স্থানে-যেমন রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল, বিমানবন্দর, হাট-বাজার, শপিং মল, সরকারি হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয়, সকল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালত ও আইনজীবী সমিতি, প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা এবং লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানযোগ্য পানি নিশ্চিত করতে হবে।
- আগামী ১০ বছরের মধ্যে, বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে নিরাপদ পানি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মূল্যে পানযোগ্য পানি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- ২০২৬ সালের মধ্যে, সকল পাবলিক প্লেসে নিরাপদ ও বিনামূল্যে পানি সরবরাহে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ওপর একটি সুস্পষ্ট আইনগত দায় আরোপিত হয়েছে-প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী পানির নিশ্চয়তা প্রদান।
উচ্চ আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি: কেন নিরাপদ পানি মৌলিক অধিকার
আদালতের যুক্তিতে উঠে এসেছে-
- নিরাপদ পানি ছাড়া জীবন, স্বাস্থ্য ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
- দূষিত পানি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
- পানি সরবরাহ ও উৎস সংরক্ষণে রাষ্ট্রের নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
এই রায়ের মাধ্যমে নিরাপদ পানিকে দাতাভিত্তিক সেবা নয়, বরং অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের নিরাপদ পানির বাস্তবতা: অগ্রগতি ও সংকট
বাংলাদেশ পানির উৎস ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও, নিরাপদ পানির গুণগত মান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বর্তমান চিত্র (সংক্ষেপে)
- প্রায় ৯৮% মানুষ উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করে, তবে।
- প্রায় ২০–২২ মিলিয়ন মানুষ এখনো আর্সেনিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
- উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে ৩৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ নিরাপদ পানির সংকটে ভুগছে।
প্রধান চ্যালেঞ্জাসমূহ
- ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ
- শিল্প ও নগর বর্জ্যের কারণে নদী দূষণ
- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খরা ও বন্যার প্রভাব
- উপকূলীয় এলাকায় পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি
- শহুরে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে অসম পানিপ্রবেশাধিকার
নীতি ও বাস্তবায়নের ফাঁক
বাংলাদেশে জাতীয় পানি নীতি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন কৌশল এবং SDG-6 বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবতায় এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে-
- স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি
- পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণে নিয়মিত ডেটা ও জবাবদিহিতার অভাব
- প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সমতাভিত্তিক সেবা নিশ্চিত না হওয়া
উচ্চ আদালতের রায় এই নীতি ও বাস্তবায়নের ফাঁকগুলোকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
সামনে করণীয় কী
বিশ্লেষকরা মনে করেন, আদালতের রায় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে-
- নিরাপদ পানিকে অধিকারভিত্তিক সেবা হিসেবে সকল নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা
- স্থানীয় সরকারকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান
- পানির গুণগত মানের নিয়মিত মনিটরিং ও উন্মুক্ত ডেটা প্রকাশ নিশ্চিত করা
- জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জলবায়ু-সহনশীল পানি সমাধান সম্প্রসারণ
- নাগরিক অংশগ্রহণ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা জোরদার করা
উচ্চ আদালতের এই রায় বাংলাদেশে নিরাপদ পানিকে কেবল একটি উন্নয়ন ইস্যু নয়, বরং মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আইনি ঘোষণাকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবতায় রূপ দেওয়া।
নিরাপদ পানি যদি সত্যিই মৌলিক অধিকার হয়, তবে তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবশ্যপালনীয় ও অনিবার্য দায়িত্ব।

Leave a comment